বাগেরহাট জেলার বদলি বাণিজ্য পুরোটাই নিয়ন্ত্রণ করেন স্বাস্থ্য পরিচালকের ঘনিষ্ঠ, সদ্য অবসরে যাওয়া বাগেরহাট সিভিল সার্জন অফিসের হিসাব রক্ষক মোঃ রেজাউল করিম। এখনও করছেন নিয়মিত অফিস। পরিচালকের নির্দেশে তিনি তৈরি করেছেন বদলির সম্ভাব্য তালিকা। ওই তালিকা অনুযায়ী বদলি করার হুমকি দিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। অনেকে টাকা নিয়েও ঠেকাতে না পেরে অন্যত্র বদলি হয়েছেন। এদিকে পরিচালক দপ্তরের শাহারিয়ার আলম সোহেল এখন সিগারেটও ঘুষ নিচ্ছেন। ভুক্তভোগী ব্যক্তি ও পরিচালক দপ্তরের একাধিক সূত্র এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
পরিচালক দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, মোঃ রেজাউল করিম বাগেরহাট সিভিল সার্জন অফিসে হিসাব রক্ষক হিসেবে ৩ যুগেরও বেশি সময় কর্মরত। সম্প্রতি অবসরে গেছেন। পরিচালক বাগেরহাটে গিয়ে সিভিল সার্জনকে সকলের সামনে বলেছেন, রেজাউল এখনও নিয়মিত অফিস করবেন। বর্তমান পরিচালকের কল্যাণে এ দায়িত্ব বহাল তবিয়তে পালন করছেন তিনি। শুধু এ দায়িত্ব না পরিচালকের দীর্ঘদিনের সুহৃদ হওয়ায় এবং বাগেরহাট পিসি কলেজে এক সাথে পড়ার সুবাদে বাগেরহাট জেলার ৯ উপজেলার সকল কর্মকর্তা-কর্মচারী বদলি করতেও বিশেষ ভূমিকা পালন করছেন। রেজাউল করিম সচ্ছল দেখে শতাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর লিস্ট তৈরি করেছেন। ওই তালিকা অনুযায়ী প্রত্যেককে ডেকে বদলির হুমকি দিয়ে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। দর-দামে না পড়লে অনেককে বদলি হতে হচ্ছে বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছেন।
একটি সূত্র জানায়, বাগেরহাটের কচুয়া উপজেলার মাঘিয়া ইউনিয়ন উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রের উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার হিসেবে কর্মরত ছিলেন কামরুজ্জামান সরদার।
পরিচালকের যোগদানের সাথে সাথে তাকে রেজাউল করিম ফোন দিয়ে দেখা করতে বলেন। তিনি দেখা করার পর তার কাছে বদলি ঠেকাতে ৫০ হাজার টাকা ঘুষ দাবি করেন। তিনি না দিলে পরিচালক কিছুদিনের মধ্যে তার কেন্দ্রে গিয়ে নানা অনিয়ম খুঁজে বের করেন। কচুয়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দুপুরের খাবার সময় সকলের সামনে তাকে রেজাউলের সাথে দেখা করতে বলেন পরিচালক নিজে।
ওই ভুক্তভোগী রেজাউলের সাথে দেখা করলে পুনরায় ৫০ হাজার টাকা দেওয়ার কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি পরিচালকের বাগেরহাট পুরাতন বাজার কেয়ার পয়েন্টের চেম্বারে গিয়ে রেজাউলের নিকট ৫০ হাজার টাকা দিয়ে আসেন। তারপরও তাকে খুলনার কয়রা উপজেলার মহারাজপুর ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্রে বদলি করা হয়। বদলির আদেশ পাওয়ার পরে রেজাউল করিমের সাথে দেখা করলে তিনি পরিচালকের সাথে দেখা করতে বলেন।
ভুক্তভোগী বলেন, পরে তিনি পরিচালকের দপ্তরে গেলে শাহারিয়ার আলম সোহেল তার মোবাইল ফোন নিয়ে নেন এবং আপনার বদলির আদেশ প্রত্যাহার করতে হলে আরও আড়াই লাখ টাকা দেওয়া লাগবে।
এ সময় তিনি বলেন, ৫০ হাজার টাকা দু’জনের কাছ থেকে চড়া সুদে এনে রেজাউল ভাইকে দিয়েছি। আমার পক্ষে আর টাকা দেওয়া সম্ভব না। চলে যাওয়ার সময় শাহারিয়ার আলম রাসেল তার কাছে এক প্যাকেট ব্যানসন সিগারেট দাবি করে। তিনি সেই সিগারেট কিনে তাকে দিয়ে আসেন বলে জানান। এখনও তিনি মহারাজপুর কর্মরত আছেন। শুধু তিনি না এমন অনেককে এভাবে বদলি করা হয়েছে। চাহিদা অনুযায়ী ঘুষ দিলে আবার বদলি প্রত্যাহার করা হয়েছে।
উদাহরণ হিসেবে একাধিক সূত্র জানিয়েছে, কামরুজ্জামানের আপন ভাই মনিরুজ্জামান সরদারকে বদলি করা হয়।
অল্পদিনের মধ্যে আবারও তাকে পূর্বের জায়গায় ফেরত দেওয়া হয়েছে। ওই মনিরুজ্জামানের স্ত্রীও একই পদে কর্মরত। রেজাউল করিমের করা ওই তালিকার সিংহভাগকে বদলি ঠেকাতে টাকা গুনতে হয়েছে বলে একাধিক সূত্র ও ওই ভুক্তভোগী জানিয়েছেন।
বাগেরহাট সিভিল সার্জন অফিসের একাধিক সূত্র জানায়, রেজাউল করিম টাকা ছাড়া কোনো ফাইলে স্বাক্ষর করেন না। তিনি বাগেরহাটের কৃষ্ণনগর এলাকায় বিশাল আলিশান বাড়ি নির্মাণ করেছেন।
এসব ব্যাপারে তার কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, মাঝে মাঝে ডাকলে তিনি আসেন। মোবাইলে অন্য কোনো কথা বলতে তিনি রাজি হননি।

